তিতাস বাড়ির মেইন গেটের দরজা খুলে সবে ভেতরে পা দিয়েছে। ইতিমধ্যে তিতাসের মা এসে দাঁড়ায় তার সামনে। কোমরে শাড়ির আঁচল গোঁজা। মুখে বিরক্ত নিয়ে তিতাসের মুখোমুখি আসে সে। "কোথায় গিয়েছিলি?"
"হাঁটতে মা। রোজকার মতন।"
তিতাস জুতো খুলে কেবিনেটের দরজা বন্ধু করে দেয়। মায়ের মুখ দেখে তিতাস বলে দিতে পারে গতকালকের ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। বরং আরও বাড়তে চলছে। সকাল সকাল অযৌক্তিক কথাতে জড়ানোর তিতাসের কোনো মন নেই। তাই মায়ের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। কিন্তু তিতাসের মা তিতাসকে যেতে দেয় না। "দাঁড়া।"
তিতাস পিছন ঘুরে তাকায়। "কী হয়েছে মা? আমার দেরি হচ্ছে। আজ ইন্টারভিউ আছে।"
ঘড়ির কাটায় আটটা। সেই কোন সাতসকালে বেরিয়েছে। এতো টা সময় সে বাইরে কাটিয়ে দিলো! তাও আবার সেই লোকটার সাথে! তিতাস ভুরু কুঁচকে চিন্তা করার মাঝে শুনতে পায়না তার মা এতক্ষণ ধরে কী বলে চলছে।
"দেখো মেয়ের কাণ্ড দেখো। আমি কী নিজের সাথে কথা বলছি তিতাস! একটা কথা কানে গেলো তোর? এতো অবাধ্য কেন হয়েছিস রে তুই? মান সম্মান সব ভেস্তে যাচ্ছে আর মহারানীর কোনো হেলদোল নেই। কী রে!"
"হ্যাঁ, মা বলো শুনছি। আজকে ইন্টারভিউ আছে সেটা নিয়ে ভাবছি আমি। তুমি বলো কী বলছিলে?"
"হ্যাঁ! তোর মাথায় এগুলোরি ভূত চেপে বসে আছে! তোর ইন্টারভিউ, তোর ক্যারিয়ার, তোর ইচ্ছা এটা ছাড়া আর কিছুটি মাইনে রাখে না, তাই তো? আমরা কে!? আমাদের ইচ্ছা, আমাদের মান-সম্মান এগুলো কী! ভেস্তে যাবে, যাবে। কী হবে, সমাজের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। কিন্তু তিতাসের তাতে কোনো যায়ে আসবে না। কর কর, যেটা ভালো বুঝিস সেটা কর।"
তিতাস এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের করে মাটির দিকে তাকিয়ে বলে, "মা! প্লিজ! সকাল সকাল শুরু করো না তো..."
"আমি শুরু করছি? আমি শুরু করছি?" সুতপা দেবীর গলার স্কেল এক ধাক্কায় অনেকটা চড়ে যায়। "তুই কালকে নিজের চোখে দেখিসনি এখানে কী কাণ্ডটা হলো? লোকগুলো অতগুলো কথা শুনিয়ে, আমাদের অপমান করে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল... কেন বলতে পারিস? শুধু আর শুধুমাত্র তোর জন্য! কতবার করে বলেছি তোকে। একটু খাওয়াটা কমা, প্রতিদিন নিয়ম করে এক্সারসাইজ কর... তুই শুনবি কেন? আমাদের কথা শুনলে তো তোর মাথার ওপর পাহাড় ভেঙে পড়ে! কী লজ্জা! কী লজ্জা! এভাবে আমাদের মুখে চুনকালী মেখে চলে গেলো আমরা মুখে কুলুপ এটে বসে রইলাম। কী পোড়াকপাল আমার! এত ভালো একটা সম্বন্ধ, শুধু তোর বেপরোয়া স্বভাবটার জন্য হাতছাড়া হয়ে গেল!"
গতকাল রাতের ঘটনাটা মনে পড়তে তিতাসের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। গলা জড়িয়ে আসে কান্নায়, কিন্তু চোখ দিয়ে জল ফেলতে দেয় না। দেখলে বলবে নাটক করছে।
'আমি এতটা অভাগী কীভাবে হলাম? নিজের মা-ও আমাকে বুঝতে পারল না! বাইরের লোকেরা আমাকে অপমান করল, আমার শরীর নিয়ে কটু মন্তব্য করল। সেখানে আমার হয়ে কথা বলার বদলে উল্টে তুমিই আমাকে হেনস্থা করছ, মা? আমি কি এতটাই খারাপ? কিসের মোটা আমি? হতে পারি আমি একটু কার্ভি, হয়তো আমার গড়নটা সামনের দিকে সামান্য ভারী। তাই বলে যে যার ইচ্ছেমতো এসে আমাকে যা খুশি বলে যাবে? আমি কি মানুষ নই? আমার কি কোনো আবেগ-অনুভূতি নেই? আমার কষ্ট পাওয়ার কি কোনো মূল্য নেই?'
"মা!! প্লিজ!! তুমি বুঝতে পারছ না? ওরা কালকে আমার চেহারার দিকে আঙুল তুলে বডি শেমিং করছিল!"
"খুব ভুল কি কিছু বলেছে ওরা? কোনো মিথ্যে কথা বলেছে? আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখেছিস কোনোদিন? এইরকম ওয়েট থাকলে কোন পুরুষমানুষ বয়ে গেছে তোকে এসে বিয়ে করতে!"
তিতাস বাকরুদ্ধ। নিজের মা যদি এমনটা বলে বাইরের লোকেদের দোষ দিয়ে কী লাভ।
"কী হয়েছেটা কী সকাল সকাল! এতো চিৎকার করছো কেন সুতপা?"
ভবতোষবাবু রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সুতপাদেবী মেয়েকে যা যা বলেছে সবই শুনেছে। সে জানে তিতাসকে এভাবে বললে হয়তো মনটা ভাঙবে কিন্তু সত্যিটাও তিতাসের জানতে হবে। মেয়েটা যদি নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতো তবে এহেন পরিস্থিতির মুখোমুখি তাদের হতে হতো না। পাড়ার প্রতিবেশীরা হাসাহাসি করছে। খবর রটতে সেকেন্ড সময় লাগে না। সকালে বাজারে গিয়ে দেখা হয়েছিল পরিতোষ তথা পাশের বাড়ির কর্তার সাথে। মেয়ের সম্বন্ধ হবার আগে ভেঙে গেছে কানাকানি খবর রেখেছে সে। সকাল সকাল এসে নিজের মন্তব্য ঝেড়ে চলে গেছে আর ভবতোষবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছে। তার মতে তার কাছে উপায় কী। শাক দিয়ে তো আর মাছ ঢাকা যায় না। বাড়ি ফিরে গিন্নিকে জানাতে সুতপাদেবীর রাগে মাথা ফেঁটে পড়ার উপক্রম। আর সেটার রেশ গিয়ে পড়ছে তিতাসের ওপরই।
ভবতোষবাবু তিতাস আর সুতপাদেবীর আড়াআড়ি এসে দাঁড়ায়। মেয়ের দিকে ঘুরে বলে, "মায়ের কথায় খারাপ পাস না, মা। তোর খারাপের জন্য বলে নি। জানিস নিশ্চই, কোনো মা-বাবা কখনো নিজেদের সন্তানের খারাপ চায় না।" ভবতোষবাবু একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকে, "আজ সমাজে আমাদের যেটুকু মান-সম্মান আছে, তা কিন্তু বহু বছরের কষ্টে অর্জিত। কালকের সম্বন্ধ ভেঙে গেছে সে নাহয় আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কিসের জন্য ভাঙলো? যে কারণটার জন্য আজ আমাদের এভাবে অপমানিত হতে হলো, সেটাকে যদি তুই নিজে শুধরে নিস, তবে তো পরের বার আর কোনো অসুবিধা হবে না! তুই আমাদের বাড়ির মেয়ে। তোর যাতে ভালো ভবিষ্যৎ হয়, সেটাই চাই আমরা। তোর মাকে তো চিনিস। কালকের পর থেকে বড্ড বেশি স্ট্রেস নিয়ে ফেলেছে, তাই হয়তো এভাবে তোকে বকছে। তোর কোনো ক্ষতি চেয়ে তো কিছু বলেনি! শুধু তুই নিজের দিকটা একটু খেয়াল রাখ, শরীরটার যত্ন নে... ব্যস, আমরা তো আর অন্য কিছু চাই না তোর থেকে।"
একটু থেমে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার বলে ওঠে ভবতোষবাবু, "যা, আজ তোর ইন্টারভিউ আছে না? লেট হয়ে যাচ্ছে তো! সুতপা, যাও সকালের জলখাবারের ব্যবস্থাটা করো তো। তিতাস মা না খেয়ে ইন্টারভিউ দিতে যাবে নাকি?"
সুতপাদেবী আর কথা বাড়ায় না। তিতাসের দিকে শেষ একটা বিরক্তিকর দৃষ্টি দিয়ে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। ভবতোষবাবু এক মুহূর্ত থমকে মেয়ের মাথায় স্নেহভরে আদর করে হাত রেখে স্ত্রীর পেছন পেছন হেঁটে চলে যায়।
তিতাস চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নেয়। 'বাবা তুমিও আমাকে একি কথা বললে। আলটিমেটলি প্রবলেমটা তাহলে আমি! আমার জন্য তোমাদের এত বছরের মান-সম্মান হানি হচ্ছে। বেশ... আমি বদলে গেলে যদি তোমাদের সেই মান-সম্মান বাঁচে, তবে সেটাই হোক। যেটা তোমরা চাও, ঠিক সেভাবে বদলাব আমি...’
তিতাস সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠে। নিজের ঘরে ঢুকে আলমারি খুলে তড়িঘড়ি একটা হালকা নীল রঙের ফর্মাল শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স বের করে নেয় সে। স্নান সেরে ভেজা চুলটা ভালো করে মুছে ঘাড়ের কাছে একটা পরিপাটি খোঁপা বাঁধে। চোখেমুখে সামান্য পাউডার আর ঠোঁটে হালকা লিপবাম লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নেয় তিতাস।
যে করে হোক, আজকের ইন্টারভিউটা তাকে ক্র্যাক করতে হবে। কালকেও অন্য একটা জায়গায় ইন্টারভিউ আছে ঠিক, কিন্তু তিতাস চায় দুটোতে যেন তার চাকরিটা পাকা হয়ে যায়। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা একটা মেয়ের জন্য কতটা জরুরি, সেটা জীবন তাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। বিয়ে হোক বা না হোক, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েদের নিজের খরচটা অন্তত নিজের চালানো উচিত। পৃথিবীটা মেয়েদের জন্য এতটা সহজ নয়। ছেলেদের জীবনেও হাজারটা লড়াই থাকে ঠিক, কিন্তু নিজের বাড়িতে অন্তত তাদের 'পরের ধন' বা 'বোঝা' হয়ে থাকতে হয় না। একটা বয়সের পর মেয়েরা যখন না থাকে ছোট বাচ্চা, না থাকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত, তখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা তাদের একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠে।
ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় দশটা। তিতাস নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরোয়। তবে বেরোনোর আগে মা-বাবাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে ভোলেনি।
বাবাকে খুশিমনে দেখে তিতাসের মনটা ভালো হলেও মায়ের বিশেষ কোনো আগ্রহ দেখেনি তিতাস। 'আমি জানি তুমি আমার চাকরির বিষয়টা নিয়ে খুশি না মা। ক্ষমা করে দেবে আমাকে কিন্তু নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে আমি বিয়ে করবো না।'
পাড়ার গলির শেষে ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। দেরি এড়াতে সে আগে থেকে বুক করে রেখেছিল। ক্যাবে বসে জানলার বাইরের ছুটন্ত শহরের দিকে তাকিয়ে তিতাস মনে মনে প্রার্থনা করে, 'ভগবান, আজকের দিনটা একটু দেখে নিও। অনেক দিন পর একটা সুযোগ এসেছে। আমি যেন ইন্টারভিউটা ক্র্যাক করে যাই। অন্তত নিজের খরচের ভারটা যেন নিজের হাতে তুলে নিতে পারি, যাতে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকতে হয়। আর কিছু চাই না। প্লিজ ভগবান, তোমার এই মেয়েটার ইচ্ছেটা আজ পূরণ করো!'
কিছুক্ষণ পর ক্যাবটা এসে থামে লাইফলাইন হাসপাতাল-এর বিশাল কাঁচের বিল্ডিং-এর সামনে। "কত হলো দাদা?" তিতাস পার্স থেকে একশো টাকার দুটো কড়কড়ে নোট বের করে ড্রাইভারের দিকে এগিয়ে দেয়।
গাড়ি থেকে নেমে বিশাল বিল্ডিংটার সামনে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ায় সে। আজ মেঘলা হয়ে এসেছে আকাশ। যেকোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে। হিমেল বাতাসে বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নেয় তিতাস। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, 'বি ব্রেভ তিতাস। বি কনফিডেন্ট। ইউ ক্যান ডু ইট!'