Room Number Thirteen in Bengali Horror Stories by Debojyoti Banerjee books and stories PDF | তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 10

Featured Books
Categories
Share

তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 10

কলকাতায় ফেরার পর প্রায় এক মাস কেটে গেলো। অনুব্রত সব কিছু ভুলে আবার কাজে যোগ দিলো।

সে কাউকে জমিদারবাড়ির কথা বলতো না। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে জানালার বাইরে হতাশ ভাবে তাকিয়ে থাকতো । কখনো কখনো মনে হতো, রাস্তার ওপারে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা শাড়ি। লাল চুড়ি। চোখে গভীর অন্ধকার। কিন্তু চোখের পলক ফেললেই সে মিলিয়ে যেতো ।

একদিন সন্ধ্যায় অনুব্রতর বাড়িতে একটি পার্সেল এলো ।

প্রেরকের নাম নেই।

পার্সেলের ভিতরে ছিল একটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট, একটি রুপোর চাবি এবং একটা চিঠি।

চিঠির হাতের লেখা তার বাবার।

 

'অনুব্রত,

যদি এই চিঠি তোর কাছে পৌঁছয়, তবে বুঝবি, আমি যে সত্য এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম, তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

আমি তোকে কখনো বলিনি, তোর মা মারা যাওয়ার পর আমি কেনো তোর সঙ্গে কলকাতায় যাইনি।

কারণ, আমি জানতাম, তুই ফিরে আসবি।

আমি জানতাম, একদিন তুই তেরো নম্বর ঘরের দরজাও খুলবি।

আর আমি এটাও জানতাম, তুই যদি সত্যিটা জানতে পারিস, তবে আমার সমস্ত পাপের হিসাব শেষ হবে।

কিন্তু একটা কথা তোকে বলা হয়নি। তোর মা সেদিন রাতে মারা যায়নি।

তোর মা বেঁচে ছিলো । তোর মাকে আমি নিজের হাতে সুড়ঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তোর মাকে লুকিয়ে রেখেছিলাম।

আমি তোর মাকে খাবার দিতাম। আমি তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলতাম।

কিন্তু একদিন তোর মা আমাকে বললো  , সে আর বাঁচতে চায় না।

তোর মা বলেছিলো , কুসুম তাঁকে ডাকছে।

আমি তোর মাকে বাঁচাতে পারিনি।

সেই রাতে আমি তোর মাকে তেরো নম্বর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।

তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

আমি ভেবেছিলাম, সব শেষ।

কিন্তু পরদিন সকালে দরজা খুলে দেখি, ঘর ফাঁকা।

শুধু দেওয়ালে লেখা—

'তুমি একা নও।'

সেদিন থেকে আমি জানি, এই বাড়িতে মৃতেরা কখনো একা থাকে না।

আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইছি না, কারণ আমি জানি, আমার ক্ষমা পাওয়ার অধিকার নেই।

শুধু একটা কথা মনে রাখিস। যদি কখনো তুই নিজের নাম ধরে ডাক শুনতে পাস, উত্তর দিবি না।

কারণ, এই বাড়ি কাউকে ভুলে যায় না।

—ইতি তোর বাবা'।

 

অনুব্রত চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর ক্যাসেটটা চালালো। প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর বাবার গলা।

"অনুব্রত... যদি তুই এটা শুনিস, তবে বুঝবি, আমি আর বেঁচে নেই।"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আবার বাবার গলা আবার শোনা গেলো।

"তোর মা আমাকে ক্ষমা করেননি। কুসুমও করেনি। আমি জানি, একদিন তারা আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু তার আগে তোকে একটা কথা জানাতে চাই।"

এমন সময় ক্যাসেটের ভিতরে হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ হলো। যেন কেউ খুব কাছে এসে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছে।

তারপর একটি মেয়ের গলা।

"অনুব্রত..."

অনুব্রত বুকের ভিতরে ধাক্কা লাগলো । এতো কুসুমের গলা… ! ক্যাসেট থেকে গলা আবার ভেসে এলো।

"তুমি কি আমাকে মনে রেখেছো ?" কুসুম বললো ।

অনুব্রত ক্যাসেট বন্ধ করতে গেলো কিন্তু বোতাম কাজ করলো না। শব্দ বাড়তে লাগলো ।

"তুমি কি মনে রেখেছো, সেদিন দরজা বন্ধ করার সময় আমি তোমাকে কী বলেছিলাম?"

অনুব্রতর হাত কাঁপতে লাগলো । তার মনে পড়ছে না। সে মনে করতে চায় না।

ক্যাসেটের ভিতর থেকে কুসুমের গলা আবার শোনা গেলো।

"আমি বলেছিলাম, ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।"

অনুব্রত চোখে জল এসে গেলো।

"বন্ধ করো!"

কিন্তু ক্যাসেট থামল না।

"আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, অনুব্রত।"

তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

অনুব্রত ভাবলো , সব শেষ।

ঠিক তখনই ক্যাসেটের ভিতর থেকে অন্য একটি গলা শোনা গেলো।

একটি পুরুষের গলা। তার নিজের গলা।

"কুসুম, দরজা খোলো। আমি এসেছি।"

অনুব্রত চমকে উঠলো । ক্যাসেটে তার নিজের গলা কী করে? সে তো কখনো ওই কথাগুলো বলেনি।

কিন্তু পরের মুহূর্তে সে শুনল, দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি গলা উত্তর দিচ্ছে।

"তুমি তো ইতিমধ্যেই ভিতরে আছো , অনুব্রত।"

ক্যাসেট বন্ধ হয়ে গেলো। একই মুহূর্তে তার ঘরের সমস্ত ঘড়ি থেমে গেলো।

রাত দুটো তেরো মিনিটে ।

অনুব্রত ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা।

সাদা শাড়ি। খোলা চুল। মুখটা অন্ধকারে ঢাকা। অনুব্রতর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

মহিলাটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

সেই মুখ তার মায়ের ।

অনুব্রতর মা এক পা এক পা করে অনুব্রতর দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।

অনুব্রত পিছিয়ে যেতে চাইল। পারল না। তার পা মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে।

অনুব্রতর মা মৃদু হেসে বললো — "বাবা, এতদিন কোথায় ছিলি?" "চল… বাড়ি যাবি না?"

অনুব্রত কাঁপতে কাঁপতে বললো , "না..."

অনুব্রতর মা হাসল তারপর বললো  , "কিন্তু তুই তো এখনও বাড়ি ফিরিসনি।"

তারপর সারা ঘর একটা সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেলো আর ঘরের সব আলো নিভে গেলো।