Titas Nodi in Bengali Love Stories by Projapoti books and stories PDF | তিতাস নদী - পর্ব ১১

Featured Books
Categories
Share

তিতাস নদী - পর্ব ১১

ফোনটা কোনোরকমে কেটে পকেটে পুরে ফেলে তিতাস। গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে আতঙ্কে। তিতাস যত পেছানোর চেষ্টা করে, লোকটা তত বেশি বুক চিতিয়ে তিতাসের একদম মুখোমুখি এসে পথ আটকায়।

"কী হলো ম্যাডাম? কাকে ফোন মারা হচ্ছিল শুনি? আপনার হিরোকে?" তিতাসের প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ায় তিতাসের কনুইয়ের কাছের জামাটা চেপে ধরার চেষ্টা চালায়। "চলুন তো! আর ড্রামা করতে হবে না! এত ক্ষণ ধরে তো ভালোভাবেই বলছি, একটু কোল্ড ড্রিঙ্কস খাবেন, ব্যস!"

"ছাড়ুন! হাত ছাড়ুন আমার! অসভ্যতামির একটা সীমা থাকে!" তিতাস নিজের সমস্ত জোর দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু দুপুরবেলার বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখ তিতাসের দিকে পড়লেও কেউ এক পা-ও এগিয়ে আসে না। দু-একজন উৎসুক চোখে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু উটকো ঝামেলায় জড়ানোর ঝুঁকি কেউ নিতে চাইছে না। 

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রৌঢ় লোক একটু ইতস্তত করে এগিয়ে এসে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, "কী ব্যাপার ভাই? রাস্তার মাঝে মেয়েটাকে এভাবে ডিস্টার্ব করছেন কেন?"

লোকটা ভয় পায় না, বরং প্রৌঢ় লোকটার দিকে রক্তচক্ষু উঁচিয়ে ভয়ংকর গলায় খেঁকিয়ে ওঠে, "অ্যাই বুড়ো! নিজের চরকায় তেল দাও তো! আমাদের পার্সোনাল ম্যাটার, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের ঝামেলায় গলগ্রহ হতে এসো না! বেশি দরদ দেখালে ভালো হবে না কিন্তু বলে দিলুম!"


বেমালুম হিংস্রতা দেখে প্রৌঢ় ভদ্রলোক থমকে যান, তারপর কোনো ঝামেলায় না জড়িয়ে এক পা পিছিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যান। চারিপাশের মানুষগুলোর চোখের ভাষা বদলে যেতে শুরু করে। প্রতিবাদের বদলে অহেতুক কৌতূহল আর জাজমেন্ট নিয়ে তিতাসের প্রতি মন্তব্য শুরু হয়। "দেখছো, আজকালকার মেয়েদের। নিজেদের প্রেম-পিরিতি সামলাতে পারে না, আর রাস্তায় এসে পাবলিকের নাটক দেখানো!"

"ঠিক বলছো। তারপর উচ-নিচ হলে ভিক্টিম সেজে বেড়াবে।"

কথাগুলো পিনের মতো বাঁধে তিতাসের কানে। কেউ একটা বারও বুঝতে চাইছে না তিতাস সত্যি বিপদে পড়েছে! এতগুলো মানুষের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তিতাস নিজেকে নিঃসঙ্গ, একাকী আর ভীষণ অসহায় বোধ করে। পিছাতে পিছাতে ওর পিঠটা গিয়ে ঠেকে বাস স্টপের লোহার পোস্টের সাথে। আর পিছোনোর রাস্তা নেই। তিতাসের চোখ বেয়ে অনবরত জলের ধারা নেমে আসে, হাত দুটো ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে।

চারপাশের মানুষের নীরবতায় লোকটা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। "কী হলো ম্যাডাম? দেখলে তো, কেউ কিচ্ছু বলবে না! এবার চলুন তো আমার সাথে!" বলে লোকটা খপ করে তিতাসের কবজিটা শক্ত মুঠোতে চেপে ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারে।

"ছাড়ুন! প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন! কেউ সাহায্য করুন!" তিতাস কান্নায় ভেঙে পড়ে আকুতি জানায়। কেউ এগিয়ে আসে না। সবাই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

রাস্তার ওপর এক তীব্র, কানফাটা শব্দে ব্রেক কষে একটা কালো রঙের চওড়া স্পোর্টস বাইক! টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে পিচ রাস্তা থেকে ধোঁয়া উঠে আসে। বাস স্টপের ভিড় একলহমায় ছিটকে সরে যায়।

বাইক থেকে নেমে, হেলমেটটা এক ঝটকায় খুলে ফেলে রুদ্র। রুদ্রর চোখের দৃষ্টি সোজা গিয়ে আটকে যায় লোকটার হাতের ওপর। যেখানে তিতাসের নরম কবজিটাকে অসভ্য জোরাজুরিতে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে রেখেছে ওই বখাটে ছেলেটা। তিতাসের চোখ দুটো লাল, গাল বেয়ে নামছে জলের ধারা। 

এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করে না রুদ্র। লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে আসে তাদের কাছে।

"হাত ছেড়ে দে। নিজের ভালো যদি চাস দূরে সরে যা।"

রুদ্রর হুমকিভরা গলায় লোকটার মুঠোটা সামান্য আলগা হয়ে যায়। তিতাস এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে যায় রুদ্রর কাছে।

রুদ্র এক পা এগিয়ে এসে মাঝপথে দু'হাতে আগলে ধরে তিতাসকে। তিতাস থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রর বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে। ওর দু'হাত মুঠো করে খামচে ধরে রুদ্রর শার্টের পিছন দিকটা। চোখ দুটো বন্ধ, মুখটা গোঁজা রুদ্রর চওড়া বুকের মাঝে। গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে কান্নার ভাঙা ফিসফিসানি, "রুদ্র... থ্যাঙ্ক গড তুমি এসে গেছো..."

রুদ্র এক হাত আলতো করে তিতাসের পিঠের ওপর রেখে তাকে ভরসা দেয়, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরে না ওই লোকটার ওপর থেকে। চোখের চাহনিতে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ।

সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা রূদ্রকে দেখে থমকে যায়। শহরের চেনা মুখ, অ্যাডভোকেট রুদ্র রায়কে চিনতে তার ভুল হয় না। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝরে পড়তে শুরু করে। ভয়ে গলা কাঁপিয়ে আধো-আধোস্বরে বলে ওঠে, "রু... রুদ্রদা... আমি তো জাস্ট..."


রুদ্র তিতাসের ওপর গ্রিপ শিথিল করে না, বরং আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে ধরে কঠোর গলায় বলে ওঠে, "আজকে বলছি এখান থেকে কেটে পড়। এর পরে যদি কোনো মেয়ের সাথে ন্যূনতম অসভ্যতামি করার সাহস দেখাস, তোকে আইন নয়, আমার মুখোমুখি হতে হবে!"

রুদ্রর চোখ দুটো ঘুরে যায় চারপাশের দর্শকের ভিড়ের ওপর। যারা একটু আগে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। রুদ্রর সামনে সবার মাথাগুলো লজ্জায় আপনাআপনি মাটিতে মিশে যায়। নিজেদের উদাসীনতার কথা ভেবে অস্বস্তিতে সবাই চোখ নামিয়ে নেয়। 

ভিড়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় রুদ্র বলে, "একটা মেয়ে দিনের আলোয় রাস্তায় একা বিপদে পড়েছে, আর আপনারা সবাই মুখে কুলুপ এঁটে তামাশা দেখলেন! মানুষের বিপদে একটু পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিকতাটুকু যদি না থাকে, তবে আপনাদের আর এদের মতন গুন্ডাদের মধ্যে তফাৎ কোথায়!"


“রুদ্র, প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো।”

তিতাসের কাঁপা গলার স্বর শুনে রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে তিতাসের হাতটা নিজের মুঠোয় নেয়। 

“চলো।”

রুদ্র তিতাসকে নিজের বাইকের কাছে নিয়ে আসে। হ্যান্ডেলের ওপর ঝোলানো হেলমেটটা খুলে নিয়ে তিতাসের দিকে বাড়িয়ে না দিয়ে নিজেই ওর মাথায় পরিয়ে দেয়। তারপর স্ট্র্যাপটা ঠিক করে লক লাগিয়ে দেয়।

“একটু দাঁড়াও।”

তিতাস চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

রুদ্র ওকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখে নেয়। কোথাও আঘাত লেগেছে কি না, জামাকাপড় ছিঁড়েছে কি না, মুখে বা হাতে কোনো আঁচড় আছে কি না সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে নেয়।

“কোথাও ব্যথা করছে?”

তিতাস ধীরে মাথা নাড়ে।

“না।”

“ভালো করে বলো। কোথাও লেগেছে?”

“না রুদ্র। আমি ঠিক আছি।”

রুদ্রর চোখ এক মুহূর্তের জন্য তিতাসের কবজির দিকে চলে যায়। যেখানে কিছুক্ষণ আগে লোকটা জোর করে ধরে রেখেছিল। চোখের দৃষ্টি আবারও শক্ত হয়ে ওঠে।

“চলো। ওঠো।”

রুদ্র বাইকে উঠে বসে। তারপর পা দিয়ে বাইকের স্ট্যান্ডটা ঠিক করে তিতাসের দিকে তাকায়।

“এইখানে পা রাখো। সাবধানে।”

তিতাস একটু ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে থাকে।

রুদ্র কাঁধটা সামান্য এগিয়ে দেয়।

“আমার কাঁধে হাত দাও। ভয় পেয়ো না। ধীরে পা রাখো।”

তিতাস রুদ্রর কথামতো বাইকের স্ট্যান্ডে পা রাখে। তারপর নিজের ভারসাম্য রাখতে রুদ্রর বাঁ কাঁধে হাত দিয়ে ভর দেয়।

“হ্যাঁ, এবার ওঠো। আস্তে।”

তিতাস ধীরে ধীরে পা তুলে বাইকের পেছনে উঠে বসে। কিন্তু বসার সময় সামান্য টলমল করে যায়। রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে ওর হাঁটুর কাছে ধরে সামলে নেয়।

“এই দেখে সাবধানে।”

তিতাস দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। তবে লজ্জায় হাত সাথে সাথে সরিয়ে নেয়।

“সরি।”

রুদ্র হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

“সরি বলার কী আছে? বসো ঠিক করে। তাছাড়া যাদের বলার তারা বলবে কেন?" রুদ্র একটু গলা উঁচিয়ে কথাটা বললো। উদ্দেশ্যটা যে ওই ভিড়ের লোকেদের জন্য বলা হয়েছে সেটা বুঝতে তিতাসের এক সেকেন্ড সময় লাগেনি। সে চুপচাপ বসে পরে। 

রুদ্র বাইকের আয়নায় একবার ওর দিকে তাকায়।

“ঠিক আছ?”

“হুম।”

“ভালো করে ধরে বসো।”

তিতাস প্রথমে দ্বিধায় রুদ্রর শার্টের পেছনটা আলতো করে ধরে।

রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে বলে, “এভাবে ধরলে ব্রেক কষালে তুমি পড়ে যাবে।”

“তাহলে কীভাবে ধরব?”

“আমাকে ধরে বসো।”

তিতাস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে দুটো হাত রুদ্রর কোমরের চারপাশে জড়িয়ে ধরে।

“তাহলে চলি।”

তিতাস আর কিছু বলে না।

রুদ্র বাইক স্টার্ট দেয়। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তার ওপর এগিয়ে যায়।

পেছনে পড়ে থাকে বাসস্ট্যান্ড। রুদ্র একবার আয়নায় চোখ তুলে পিছনের ভিড়টার দিকে তাকায়। যে মানুষগুলো একটু আগে একটা মেয়ের বিপদের সময় এক পা এগিয়ে আসেনি, তারা এখন মুখে মুখে নিশ্চয়ই ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা করবে। সাহায্যের সময় সবার পা যেন মাটিতে পেরেক দিয়ে আটকে থাকে, অথচ গসিপের সময় একই মানুষগুলোর জিভে যেন পাখা গজায়!

রুদ্রর ঠোঁট শক্ত হয়ে আসে। “ছিঃ।”

তিতাস শুনতে পায় না। সে তখন চুপচাপ বাইকের পেছনে বসে থাকে।